হাতিয়া নলচিরাঘাট চোরাই তেলের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য | তদন্ত রিপোর্ট

শনিবার, ১৮ Jul ২০২৬, ১০:১৯ পূর্বাহ্ন

হাতিয়া নলচিরাঘাট চোরাই তেলের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য

হাতিয়া নলচিরাঘাট চোরাই তেলের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য

Oplus_16908288

Manual1 Ad Code

নোয়াখালী সংবাদদাতা: উপকূলীয় জনপদ হাতিয়ার বুক চিরে বয়ে যাওয়া মেঘনার জোয়ার-ভাটার মতোই অনিয়ম এখানে চিরচেনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চোরাই তেলের কারবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে এখানে চলছে রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব। নলচিরা ঘাট এখন আর কেবল সাধারণ নদীপথের প্রবেশদ্বার নয়, বরং এটি চোরাচালানিদের এক ‘নিরাপদ স্বর্গরাজ্য’। একসময় চোরাচালান মানেই ছিল রাতের আঁধারে লুকিয়ে করা কোনো কাজ। কিন্তু নলচিরা ঘাটের চিত্র ভিন্ন। এখানে দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে

আজিম, বাসু মেম্বার, আতিক, আসিক, বিএনপি নেতা মেশকাত ও জহির। সিন্ডিকেট চক্র ২, আলাউদ্দিন সেরাং তিনি একাই পরিচালনা করেন সিন্ডিকেট চক্র ৩, সাহেদ, খানসাব, মুজিব, জসিম ও মাকছুদ। সিন্ডিকেট চক্র ৪-মঞ্জু সেরাং, আব্দুর রব মেম্বার, সানু ফকির, বাবলু, আজাদ, শাহীন মেম্বার, নবির, মানসুর ও ইরাক। সিন্ডিকেট চক্র ৫, রিয়াজ, রাবু, সাদ্দাম, করিম পিটার, বিএনপি নেতা মেসকাত, জহির, ফারুক এবং দানা মামুন। সিন্ডিকেট চক্র ৬, হাছান, সাদ্দাম, সাজু, বিএনপি নেতা মেসকাত, জহির, ফারুক, আলী, রহিম বাংলাবাজার, রাকিব এবং জামসেদসহ আরো রয়েছে।

Manual3 Ad Code

জাহাজ থেকে নামানো হচ্ছে তেল, কয়লা, পাথর, লবণ, চিনি ও গমসহ নানা অবৈধ মালামাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে গোপনীয়তার তোয়াক্কা না করেই প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে এই কারবার।

স্থানীয়দের মতে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কোনো সাধারণ চোরাকারবারির পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়া।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীর প্রত্যক্ষ মদদে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক পালাবদলের পরও সিন্ডিকেটটি নতুনভাবে প্রভাব বিস্তার করে আগের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

Manual3 Ad Code

স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানু-যায়ী, জানা যায় অবৈধ চোরাই তেলের কার্যক্রমে সর্বমোট ১১টি সিন্ডিকেট চক্র রয়েছে। সিন্ডিকেট চক্র ১, সিন্ডিকেট চক্র ৭, মন্নান, আকবর, ইব্রাহীম, মিরাজ এবং কাজী। সিন্ডিকেট চক্র ৮, ইব্রাহীম, ফয়েজ, শাখাওয়াত, ফারুক, তুষার ও মাইনউদ্দিন। সিন্ডিকেট চক্র ৯, এর প্রধান ইরাক তিনি একাই পরিচালনা করেন। সিন্ডিকেট চক্র ১০, এর প্রধান মহিন তিনি একাই পরিচালনা করেন। সিন্ডিকেট চক্র ১১, এর প্রধান হাছান মেম্বার তিনিও একাই পরিচালনা করেন। এই সিন্ডিকেটের জড়িত মূল কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে হাছান, বাসু মেম্বার, মঞ্জু সেরাং, আজিম, সাহেদ, আলাউদ্দিন সেরাং, রিয়াজ, আব্দুর রব মেম্বার, আকবর, ইব্রাহীম, ফয়েজ, আজাদ, ইরাকসহ আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন বলে অভিযোগ।

এই বিষয়ে সিন্ডিকেট প্রধানদের মধ্যে হাছান স্বীকার করে বলেন, সবাই জানে আমি অবৈধ তেলের ব্যবসা করি, আমিও মিথ্যা বলছি না। আমি যেহেতু অবৈধ তেলের ব্যবসা করছি তাহলে তো প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাইকে ম্যানেজ করতে হবে তাই না।

তিনি আরো বলেন, আমি একা খাইনা, বিএনপি, এনসিপি সহ বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা আর প্রশাসনের কর্মকর্তারা ও পায়।

এই বিষয়ে আরেক সিন্ডিকেট প্রধান নলচিরা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মেশকাত বলেন, দীর্ঘ ৭ মাস ধরে এই ব্যবসা করছি কিন্তু প্রচুর লস দিতে হচ্ছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে এই ব্যবসা আর করবো না।

এই বিষয়ে সিন্ডিকেট চক্রের বাসু মেম্বার অস্বীকার করে বলেন, আমি ৫ আগস্টের আগে এই ব্যবসা করেছি কিন্তু ৫ আগস্টের পরে এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি।

এই বিষয়ে সিন্ডিকেট চক্রের আরেকজন প্রধান মঞ্জু সেরাং বলেন, আজকে অনেক দিন ধরে আমি অসুস্থ তাই এই ব্যবসার সাথে আমি এখন আর নেই তবে অন্য সবাই আছে কাজ করেন। আর এটা এখন পরিচালনা করেন বাংলা বাজারের কিরন।

Manual1 Ad Code

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব সিন্ডিকেট চক্রের প্রধান থেকে মাসোয়ারা পাচ্ছেন প্রশাসন কর্মকর্তা, বিএনপি, এনসিপির, অনেকজন নেতাকর্মী, উকিল, সাবেক প্রভাবশালী চেয়ারম্যান সহ প্রায় ২০-৩০ জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, “আমরা সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে থাকতে হয়। মুখ খুললেই নেমে আসে হামলা ও মামলা। প্রশাসনের কাউকে কোনো তথ্য দিলে সেটিও তারা জেনে যায়। পরে এসে আমাদের মারধর করে।

Manual5 Ad Code

তাদের অভিযোগ, এই তেলের ব্যবসাকে ঘিরে এলাকায় বাড়ছে মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং, এমনকি অস্ত্রের মহড়াও। দিনের বেলা এলাকা স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পরে এটি এক অন্ধকার রাজ্যে পরিণত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসন সবকিছু জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না।

তাদের দাবি, মাসোহারা দিয়ে সিন্ডিকেটটি নির্বিঘ্নে চলার সুযোগ পাচ্ছে। এই অবৈধ কারবারের ফলে রাষ্ট্র যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি পথে বসছেন হাতিয়ার বৈধ ব্যবসায়ীরা। বৈধ পথে ট্যাক্স দিয়ে পণ্য আনলে খরচ অনেক বেশি পড়ে। অন্যদিকে চোরাই পণ্য কম দামে বাজারে ছাড়ায় বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। ফলে বাজারে প্রায়ই পণ্যের দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা ঘটছে।

সিন্ডিকেটে জড়িত বলে আলোচিত বাসু মেম্বার বলেন, তার তেল ব্যবসার বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। তবে জাহাজ থেকে কম দামে তেল কেনার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, “এটার কোনো কাগজ নেই।”

তিনি জানান, এসব তেল তারা নিজ দোকানে না রেখে স্থানীয় বিভিন্ন দোকানে পাইকারি সরবরাহ করেন। বৈধ কাগজ ছাড়া তেল কেনাবেচা আইনগতভাবে রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ বাণিজ্যের আওতায় পড়ে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

হাতিয়ার সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, নলচিরা ঘাটকে এই অভিশপ্ত সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করা হোক। তারা চান দ্রুত সময়ের মধ্যে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সমন্বিত অভিযান। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই লুটপাট বন্ধ করে নলচিরা ঘাটকে আবারও একটি স্বাচ্ছ ও সুশৃঙ্খল বাণিজ্যিক বন্দরে রূপান্তরিত করা হোক।

এ বিষয়ে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, নলচিরা ঘাটে অবৈধ তেলের বিষয়ে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত টহল অব্যাহত রেখেছি। এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code
error: Content is protected !!